» বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও আমরা

প্রকাশিত: ০৫. অক্টোবর. ২০১৯ | শনিবার


তুফান মাজহার খান

একটা সময় ছিল যখন মানুষ পাহাড়ের গুহায়, বনে, জঙ্গলে বসবাস করত। তখন সভ্যতার কোনো চিহ্নমাত্র মানুষের মধ্যে ছিল না। সেই প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত হাজার হাজার বছর পেরিয়ে গেছে। মানুষ সময়ের প্রয়োজনে সভ্য জগতে চলে এসেছে। মানুষ শিক্ষিত হয়েছে। গড়েছে বসবাসের জন্য সুন্দর সুন্দর আবাসন। সৃষ্টি হয়েছে কল-কারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, উদ্ভাবিত হয়েছে সহজ থেকে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা। কয়েক হাজার মাইল রাস্তা পাড়ি দিয়ে দিচ্ছে নিমিষেই। মানুষ এখন সভ্যতার এক সুউচ্চ শিখরে পৌঁছে গেছে। পৃথিবীকে ছাপিয়ে চলে গেছে পৃথিবীর বাইরে। জানতে পেরেছে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের প্রকৃত রূপকে। জ্ঞান অর্জন করেছে জগৎ সৃষ্টির রহস্য ও ধ্বংসের কারণ সম্পর্কে। বলতে গেলে বর্তমান প্রজন্ম এখন পৃথিবীর সর্বোচ্চ সুবিধা ভোগ করা প্রজন্ম। এতদসত্ত্বেও দুঃখজনক ব্যাপার এই যে, আমরাই এ সুন্দর, নির্মল ও বাসযোগ্য পৃথিবীটাকে বসবাসের অযোগ্য করে ফেলছি দিনের পর দিন। নিয়ে যাচ্ছি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। অথচ আমরা চাইলেই এই ধ্বংস থেকে পৃথিবীটাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি বহুকাল। একটু সচেতনতা আর পরিপাটি জীবনব্যবস্থাই পারে আমাদের এরূপ ধ্বংসলীলা থেকে পৃথিবীটাকে রক্ষা করতে। বর্তমান সময়ে বিশ্বের পরিবেশগত প্রধান সমস্যাসমূহের অন্যতম হলো বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। এটি জলবায়ুর এমন এক পরিবর্তন যা প্রক্রিয়াগতভাবে গ্রিনহাউজ প্রভাবের সাথে তুলনীয়। এই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে আজ আমরা সম্মুখীন হচ্ছি বিভিন্ন ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের। সেসবের মধ্যে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, ভাঙন, জলোচ্ছাস, টর্নেডো এবং ভূমিকম্প অন্যতম। প্রতিবছর কোটি কোটি মানুষ এসব দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, প্রাণ হারায়। কিন্তু আমরা কি আদৌ একবার চিন্তা করে দেখেছি যে, আমরা যেগুলোকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে আখ্যায়িত করছি সেগুলো কি আসলেই প্রাকৃতিক নাকি এর পেছনে মানুষেরও হাত রয়েছে? আমি বলব এসব দুর্যোগের শতকরা পঞ্চাশ ভাগ সৃষ্টি হয় মানুষের কারণে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায়ী আমরা নিজেরাই।
আজ জলবায়ুর উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্র স্ফীত হচ্ছে। বরফ গলে গলে বৃদ্ধি পাচ্ছে সমুদ্রের উচ্চতা। ডুবে যাবার উপক্রম হচ্ছে বিভিন্ন নগর, স্থাপনা। ইতালির ভেনিস নগরী তো আর পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা। এমনকি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল নিয়েও সংশয় রয়েছে বেশ। আর এ আবহাওয়ার উষ্ণায়নের মাধ্যমে সমুদ্র স্ফীত হওয়ার জন্যও দায়ী আমরাই। নানাভাবে মনের অজান্তেই আমরা জলবায়ুর তাপমাত্রা বাড়িয়ে চলেছি দিনের পর দিন। যেমন ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধি, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের আধিক্য, রিসাইক্লিং না করা, কল-কারখানার কালো ধোঁয়াসহ নানাবিধ কাজ। আবার বৈশ্বিক উষ্ণায়নে আরেকটি বিষয় ব্যাপকহারে ভূমিকা রাখছে তা হলো বৃক্ষ নিধন। গাছপালা, বন-জঙ্গল ধ্বংস করে আজ আমরা সভ্যতার চিহ্ন তৈরি করছি। কিন্তু এভাবে গাছপালা কমে যাওয়ায় বৃষ্টিপাত কমে যায়, অক্সিজেনের অপ্রতুলতা দেখা দেয়, রোগ-বালাই বাড়ে। আবার ভাঙনের কারণ হিসেবেও প্রথমেই রাখা হয় এই গাছপালা নিধনকে।
বর্তমানের প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে অদূর ভবিষ্যতে এই পরিবর্তিত অবস্থাকে পূর্বের অবস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া কখনোই সম্ভব হবে না। গত একশত বৎসর পূর্বের গড় তাপমাত্রার তুলনায় বর্তমান বিশ্বে গড় তাপমাত্রা প্রায় ০.৬০°সে বৃদ্ধি পেয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জলবায়ুগত পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা করা হচ্ছে যে, ২১ শতকের সমাপ্তিকালের মধ্যে বিশ্ব তাপমাত্রায় আরও অতিরিক্ত ২.৫° থেকে ৫.৫°সে তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে। ফলে, পৃথিবীপৃষ্ঠের পানির স্ফীতি, অত্যুচ্চ পর্বতের বরফশীর্ষ এবং মেরু অঞ্চলের হিমবাহের দ্রুত গলনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির উচ্চতার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরণের পরিবর্তন ঘটতে পারে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী গ্যাসগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো কার্বন-ডাই-অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, মিথেন, ক্লোরোফ্লোরোকার্বন এবং বায়ুমন্ডলের জলীয়বাষ্প। শিল্পায়ন, কৃষি সম্প্রসারণ (বিশেষত আর্দ্র ধান চাষ), স্বয়ংক্রিয় যানবাহনের সংখ্যাগত বৃদ্ধি, বনাঞ্চল উজাড় হওয়া- এ সবগুলিই প্রথম চারটি গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধিতে তাৎপর্যময় ভূমিকা রাখে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় বায়ুমণ্ডলে বিশেষভাবে নির্দিষ্ট গ্রিনহাউজ গ্যাসসমূহের উপস্থিতির মাত্রার উত্তরোত্তর বৃদ্ধিকে। বায়ুমন্ডলীয় এই গ্যাসসমূহ হ্রস্বতরঙ্গের সৌর রশ্মির পৃথিবীতে পৌঁছতে বাধার সৃষ্টি করে না, অথচ দীর্ঘতরঙ্গের অবলোহিত বিকিরণ পৃথিবী থেকে বহির্বিশ্বমন্ডলে যেতে বাধার সৃষ্টি করে, যার ফলে পৃথিবীপৃষ্ঠ উষ্ণ হয়ে ওঠে। স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিটি এলাকায় জোয়ারভাটা, বায়ুমন্ডলীয় চাপ এবং বাতাসের বেগের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের অবিরাম পরিবর্তন ঘটে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সমুদ্রপৃষ্ঠ পরিবর্তন একমাত্র বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘটে থাকে। বিশ্ব উষ্ণায়ন সমুদ্রের পানির একটি তাপগত স্ফীতি ঘটাবে। তাপমাত্রার বৃদ্ধি মেরু ও পর্বতের বরফশীর্ষ এবং বরফের চাঁই গলনেও ভূমিকা রাখবে। বদ্বীপীয় ভূমি হিসেবে বাংলাদেশের একটি বিশাল এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে জলমগ্ন হবে। দেশটির কত অংশ সমুদ্রগর্ভে হারিয়ে যেতে পারে তা নির্ভর করবে এর সঙ্গে সম্পর্কিত সমুদ্রপৃষ্ঠ পরিবর্তনের ওপর। একটি টাস্কফোর্স প্রতিবেদন এমন ভবিষ্যদ্বাণী করেছে যে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বৃদ্ধি পেলে প্রায় ২২,৮৮৯ বর্গ কিলোমিটার ভূমি সমুদ্রে হারিয়ে যাবে, যা বাংলাদেশের মোট এলাকার প্রায় ১৫.৮%। ধারণা করা হয় যে, ২১০০ সালের মধ্যে পৃথিবীপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ১.৮° থেকে ৬.৩° সেলসিয়াসের মতো বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ০.৫ মিটার বৃদ্ধি পাবে এবং মিসিসিপি থেকে বাংলাদেশে উচ্চ মাত্রায় জনসংখ্যা অধ্যুষিত উপকূলীয় এবং বদ্বীপ এলাকাসমূহে ব্যাপক প্লাবনের হুমকি দেখা দেবে।
তাই আমাদের উচিত যাতে অামাদের কোনো কাজ বৈশ্বিক উষ্ণায়নে প্রভাব না ফেলে সেদিকে খেয়াল রাখা। তা না হলে অচিরেই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে মানবসভ্যতা।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৪৯ বার

Share Button