» লেখক আমিনুল ইসলামের ছোটগল্পঃ একটি ভুল ও উবারের গাড়ি

প্রকাশিত: ১৪. অক্টোবর. ২০১৯ | সোমবার

ছোটগল্পঃ একটি ভুল ও উবারের গাড়ি

স্টার কাবাব ধানমন্ডির একটি বিখ্যাত কাবাব হাউজ৷ এখানে আলম ভাই ও নাদিম ভাই মিলে কাবাব-পরটা খেলাম৷ তারপর বিল দিয়ে আমরা সবাই স্টার কাবাবের সামনে দাঁড়িয়ে আছি৷ একটু আগে এক পরসা বৃষ্টি হয়েছে৷ এতে জনমনে শান্তি ফিরে এসেছে৷ কয়েকদিন ধরে প্রচন্ড গরম পড়েছিল৷
এখন দশটা বাজে। আমি তেজগাঁও সাতরাস্তার মোড়ে যাবো। এই সময় ঢাকা শহরের রাস্তায় প্রচুর জ্যাম থাকে৷ বাসে উঠলে গন্তব্যে পৌঁছাতে অনেক সময় লাগবে। তাই উবারে একটি মোটরসাইকেল রিকুয়েষ্ট দিলাম৷ গাড়ি আসতে এক মিনিট সময় লাগবে৷

ধানমন্ডি অনেকদিন পর এলাম৷ এখানকার অনেক কিছু বদলে গেছে৷ ছাত্র জীবনে প্রায়ই আসতাম৷ ধানমন্ডি লেক আমার প্রিয় একটি জায়গা ছিল৷ তখন এখানকার রাস্তায় জ্যাম ছিল না বললেই চলে৷ এতো এতো কমার্সিয়াল বিল্ডিংও ছিল না। এখন এখানে হাসপাতাল, ব্যাংক, বীমা, প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিজগিজ করছে৷

আজ এসেছি একজন নিকট আত্নীয়কে দেখতে, যিনি এখানের একটি হাসপাতালে ভর্তি আছেন৷ কিছুক্ষণ আগে তাঁর শরীরে একটি অপারেশন হয়েছে৷ অপারেশনটি সাকসেসফুল হয়েছে বলে আমাদের সবার মন কিছুটা ভাল আছে৷

উবারের ড্রাইভার আমাকে ফোন দিয়ে বলল, ‘আস্সালামুআলাইকুম স্যার।’

‘ওয়ালাইকুম আস্সালাম।’

‘স্যার, আপনি কোথায়?’

‘আমি স্টার কাবাবের সামনে দাঁড়িয়ে আছি৷ এক হাত উপরে তুলে আছি৷’

আমি ফোনটি রাখতে না রাখতেই আমার সামনে একটি মোটরসাইকেল এলো৷ আমাকে দেখে ড্রাইভার হাত তুললো। আমিও সাথে সাথে সোজা ড্রাইভারের পিছনে উঠে বসলাম৷

মোটরসাইকেল খুব স্পিডে চলছে৷ শরীরে ঠান্ডা বাতাস লাগছে৷ গুড়িগুড়ি বৃষ্টিও হচ্ছে৷ আমি ড্রাইভারকে বললাম, ‘ভাই, গাড়ি একটু আস্তে চালান৷’

ড্রাইভার বলল, ‘ঠিক আছে, স্যার৷’

আমার কথা মতো ড্রাইভার গাড়ির গতি কমিয়ে চালাচ্ছে৷ এ্যাপে ড্রাইভারের রেটিং সিস্টেম চালু থাকায় তারা যাত্রীদের সাথে সুন্দর ব্যবহার করে৷ এটি খুব ভাল সিস্টেম। অথচ লোকাল বাসে উঠলেই বুঝা যায় কন্ট্রাক্টর ও ড্রাইভারদের ব্যবহার কতটা ভাল৷ আমি মনে করি তাদেরও এ্যাপের আওতায় এনে রেটিং চালু করা উচিত। তাদের রেটিং চালু করলে আমি লোকাল বাসের ড্রাইভার ও হেলপারদের জিরো দিবো৷

গাড়ির গতি কম থাকায় আমার কথা বলতে সুবিধা হচ্ছে৷ আমি ড্রাইভারকে বললাম, ‘ভাই, আজ কত টাকা ইনকাম করেছেন?’

‘আপনাকে নিয়ে এগারোটা ট্রিপ দিয়েছি৷ প্রায় এক হাজার টাকা ইনকাম হয়েছে৷ আমার টার্গেট এক হাজার টাকা৷’

‘খুব ভাল৷’

‘আপনি কি ফুল টাইম নাকি পার্ট টাইম চালান?’

‘পার্ট টাইম৷ বিকাল চার’টার পর বের হই৷’

‘পার্ট টাইম মোটর সাইকেল চালিয়ে দৈনিক এক হাজার টাকা ইনকাম করছেন৷ তাহলেতো খুবই ভাল৷’

‘আমি সকাল আট’টা থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত একটি চাকরি করি৷ বেতন পাই মাত্র চৌদ্দ হাজার টাকা৷ পরিবারের সবাই জানে আমি ঢাকায় চাকরি করি৷ গ্রামের সবাই আমাকে খুব সম্মান করে৷ আমি একাই ঢাকায় থাকি৷ অফিস শেষে উবারের গাড়ি চালাই৷ চাকরি করে যে টাকা বেতন পাই তা একটুও খরচ করি না৷ এক বছর ধরে উবারে গাড়ি চালাচ্ছি। বেতনের টাকা জমতে জমতে আমার ব্যাংক একাউন্টে এক লক্ষ আটষট্টি হাজার টাকা হয়েছে৷ এভাবে জমাতে থাকলে কয়েক বছর পর একটি প্রাইভেট কার কিনতে পারবো। তখন মোটসাইকেল ছেড়ে কার চালাবো৷ ইনকাম কয়েকগুন বেড়ে যাবে৷’

‘বাহ্। খুব ভাল৷ আপনার পরিকল্পনা ভাল৷ আপনি জীবনে সাফল হবেন৷’

‘দোয়া করবেন, স্যার৷’

আমি ড্রাইভারের পিছনে বসে মোবাইল দেখছি৷ উবার এ্যাপে ড্রাইভারের প্রোফাইল দেখছি৷ তাঁর রেটিং ৪.৯ (৫ এর মধ্যে)৷ অনেক যাত্রী-ই তার ভাল রিভিউ দিয়েছেন৷ কেউ লিখেছেন, ওয়েল বিহেভিয়ার, কেউ বলছেন গুড ড্রাইভার, কেউ বলেছেন নেভিগেশন নলেজ গুড।
রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখি মহাখালী চলে এলাম৷ তারপর গাড়িটি গুলশানের দিকে ছুটছে৷ আমি ড্রাইভারকে বললাম, ‘আপনি এই রোডে যাচ্ছেন কেন?’

‘এই রোডে জ্যাম কম, তাই৷’

আমিও ড্রাইভারের কথায় বিশ্বাস করলাম৷ আমি ভাবছিলাম, উবারের গাড়িতে ভাড়া নিয়ে ঝামেলা নাই। ড্রাইভার যেদিক দিয়ে যাক, তাতে আমার কি?

আরেকটু এগোতেই আমার মোবাইলে একটি ফোন এলো৷ ওপাশ থেকে বলছে, ‘স্যার, আপনি কোথায়?’

আমি বললাম, ‘আপনি কে?’

‘আমি উবারের মোটরসাইকেল নিয়ে আপনার জন্য স্টার কাবাবের সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি৷ আপনি কোথায়, স্যার?’

‘আমি তো আপনার মোটরসাইকেলেই যাচ্ছি৷’

আমি ভয় পেয়ে গেলাম৷ আমি ড্রাইভারকে দ্রুত গাড়ি থামাতে বললাম৷ সে গাড়ি থামিয়ে বলল, ‘কি হযেছে, স্যার?’

আমি বললাম, ‘আপনি আমাকে কোথায় নিচ্ছেন?’

‘কেন? মেরুল বাড্ডা৷’

‘কেন?’

‘আপনার রিকুয়েষ্ট’টা মেরুল বাড্ডা ছিল৷’

‘আরে আমি-তো তেজগাঁও সাতরাস্তা দিয়েছিলাম৷’

ড্রাইভার তার মোবাইলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘স্যার, আপনার নাম জসিম?’

‘না।’

‘তাহলে জসিম কে?’

‘জানি না৷’

আমি আমার মোবাইলের স্কিনে তাকিয়ে বললাম, ‘আপনার নাম কি জয়নাল?’

‘না, স্যার৷ আমার নাম আব্দুর রশিদ।’

আমি মোটরসাইকেলের পিছনে গিয়ে নম্বর প্লেট দেখে বুঝলাম, এটি সেই মোটরসাইকেল নয়৷ ভুলটি হয়েছে স্টার কাবাবের সামনে৷ আমি যখন হাত তুলেছি, আব্দুর রশিদও হাত তুলেছিল। আমি নম্বর প্লেট না দেখেই গাড়িতে উঠে বসলাম৷

ড্রাইভার বলল, ‘আমি যে যাত্রীকে ফোন দিয়েছিলাম, তিনিও বলেছিলেন স্টার কাবাবের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন৷’

অতঃপর ড্রাইভার তার সত্যিকারে যাত্রী জসিমকে ফোন দিল৷ তাকে সরি বলল।
আমি যে গাড়িতে আসার কথা ছিল তাকেও ফোন দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছি৷

ড্রাইভার মোবাইলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘স্যার, ভাড়াতো অনেক বেশি এসে গেছে৷’

আমি বললাম, ‘ট্রিপটা এখানেই কমপ্লিট করে দিন।’

ড্রাইভার তার ট্রিপ কমপ্লিট করল। উবারের এ্যাপে আমার নামে ট্রিপ হয় নি, জসিমের নামে হয়েছে৷ কিন্তু ভাড়া দিলাম আমি৷

তারপর ড্রাইভার এ্যাপ ছাড়া আমাকে তেঁজগাও সাতরাস্তায় নিয়ে এলো৷ আমি গাড়ি থেকে নেমে তাকে এ্যাপের বেশি ভাড়া দিতে চাইলাম৷ কিন্তু ড্রাইভার বলল, ‘বিশ-ত্রিশ টাকার বিষয়। বেশি দেওয়ার দরকার নাই৷ আপনি আপনার ভাড়া দিলেই হবে, স্যার৷’

আমি জোর করে ড্রাইভারকে বেশি টাকা দিয়ে চলে এলাম৷ আমার দেখা সে একজন অসাধারণ ড্রাইভার ছিল।

ড্রাইভারের নম্বরটি সেভ করে রেখেছি৷ তিন বছর পর তাকে একবার ফোন করবো৷ সে নিশ্চয় তখন চার চাকার গাড়ি কিনবে৷ তার গাড়িতে চড়ার খুব ইচ্ছা।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২৮৭ বার

Share Button