» লেখক আমিনুল ইসলামের ছোটগল্পঃ সেরের উপর সোয়া সের

প্রকাশিত: ১৫. অক্টোবর. ২০১৯ | মঙ্গলবার

সেরের উপর সোয়া সের
-আমিনুল ইসলাম

জান্নাত বসে বসে নতুন একটি ফেসবুক আইডি খুলছে৷ তবে তার নিজের নামে নয়৷ নাম দিল সুমাইয়া। প্রোফাইল পিকচার হলো একটি লাল গোলাপের কলি৷ সাধারণত বেশির ভাগ মেয়েদের প্রোফাইল পিকচার ফুল হয়ে থাকে৷ তারা নিজেকে ফুল ভাবতে পছন্দ করে। বেশির ভাগ মেয়েই ছেলেদের ঘুরাতে পছন্দ করে৷ আবার ব্যপারটা এমনও হতে পারে যে তারা পরখ করে দেখতে চায়, ছেলেটা আসলে তাকে সত্যিকারে ভালবাসে কিনা। সময় নিয়ে বুঝে শুনে কাজ করা মেয়েদের একটি ভাল গুন৷ তবে মাঝে মাঝে ভিন্ন কিছুও ঘটে৷ একটি ভাল ছেলেকে বেশি সময় ঘুরালে তাকে আর পাশে পাওয়া যায় না৷ দীর্ঘ সময় ধরে মেয়েদের পিছে ঘুরঘুর করা ছেলেগুলো সাধারণত ততটা ভাল হয় না৷

কিছুদিন জান্নাত একা থাকতে চায়। কেউ যেন তাকে ফোন করতে না পারে। তার মোবাইলটি বন্ধ করে বাসায় রেখে এসেছে৷ মার্কেট থেকে নতুন আরেকটি মোবাইল কিনে তাতে নতুন সিম ঢুকিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে৷ সে এখন তার বান্ধবি মনির বাসায়৷

তুই যে এভাবে ঘর ছেড়ে চলে এলি, তোর স্বামী খোঁজাখুঁজি করবেনা?

তা তো করবেই৷ খুঁজতে থাকুক৷ ফাহিমের সাথে আমার মনে হয় আর সংসার করা হবে না৷ সে আমার প্রতি চরম উদাসীন। কোন খেয়ালই রাখেনা৷ সারাদিন থাকে তার আমদানী-রপ্তানী ব্যবসা নিয়ে৷ আমি যে তার বউ, একা একা সারাদিন বাসায় থাকি, তার মনেই থাকেনা৷ আর কেউ মনে হয় ব্যবসা করে না?

তোদের কি আবার ঝগড়া হয়েছে?

মনি, কি যে বলিস! ঝগড়াতো সামান্য ব্যপার৷ বল যুদ্ধ হয়েছে কিনা?

এবার কি নিয়ে হলো রে?

আর বলিস না৷ সারাদিন একা একা বসায় থাকি৷ তিনদিন আগের কথা, সে বাসায় এলো রাত এগারটা দশ মিনিটে৷ এসে হাত মুখ ধুয়ে বাথরুম থেকে বের হল। আমার সাথে তখনও কথা হয়নি। তাছাড়া আমি তার উপর খুব রেগে আছি৷ ঠক সেই সময় কে যেন কলিং বেলে টিপ দিল৷ আমি যেতে চাইলাম, কিন্তু ফাহিম বলল তার লোক এসেছে। সে নিজেই দরজা খুলল৷ তিনজন লোক এসেছে৷ তাদের ড্রয়িং রুমে বসিয়ে আমাকে চা বানাতে বলল৷ আমার মেজাজ চরম খারাপ হওয়ার কথা৷ তারপরও নিজেকে শান্ত রেখে চা বিস্কুট পাঠালাম৷ তিনজনের একজন চলে গেল। বাকি দুইজন নাকি রাতে থাকবে৷ রাতে থাকার কথা শুনে মাথাটা আরও গরম হয়ে গেল৷ তারা এসেছে ফিনল্যান্ড থেকে৷ সাদা চামড়ার মানুষ৷ তুই জানিস আমি এমনিতে সাদা চামড়ার লোক পছন্দ করিনা৷ কত সুন্দর ছেলেরা আমার পিছনে ঘুরেছে ভার্সিটিতে, তুইতো সবই জানিস৷ কিন্তু আমি ফাহিমকে বিয়ে করেছি, কারণ সে শ্যাম বর্ণের ছেলে৷

ওরা কেন এলো তোর বাসায়?

আর বলিস না৷ লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার কোন এক প্রত্যন্ত গ্রামে একজন সাধক নাকি গরুর গোবর থেকে তেল আবিস্কার করেছে৷

গোবর থেকে তেল। হা হা হা…

তুই হাসিস না৷ ঐ তেল রান্না করার তেল না।

তাহলে কিসের তেল?

আরে রান্না করার তেল হলে বিনা পয়সাও কেউ নিবেনা৷ গোবরের তেলের রান্না ভাবতেই গিন্না লাগছে৷ আবার জ্বালানি তেলও নয়৷ যদি জ্বালানি তেল হতো তবে অন্তত গাড়ি ভাড়া কমে যেত।

রান্না করার তেলও না, জ্বালানি তেলও না। তবে কিসের তেল?

বলছি সব। ঐ তেল নাকি গায়ে মাখালে বুড়ো মানুষ জোয়ান হয়ে যায়৷ তাই ফিনল্যান্ড থেকে তারা এসেছে এই তেল পরীক্ষা করতে৷ যদি এই তেল তাদের পরীক্ষায় পাশ হয়ে যায়, তবে তারা তাদের দেশে আমদানি করবে৷ আর রপ্তানীর সব দায়িত্ব পড়বে ফাহিমের৷ এতে নাকি অনেক লাভ হবে৷ অল্প দিনে অনেক টাকা পয়সার মালিক হওয়া যাবে৷

হা হা হা…

ভালইতো৷ তোর সমস্যা কি তাতে?

পরের দিন ভোরেই তারা রওয়ানা হলো লক্ষ্মীপুরে। সারাদিন কোন যোগাযোগ নাই৷ রাত দশটার দিকে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন এলো৷ ফাহিমের ফোন৷ সে বলল, সে খুব বিপদে পড়েছে৷ দুই বিদেশীসহ তাদের সবকিছু ছিনতাই হয়ে গেছে৷ সাধকের তৈরি গোবরের তেল তিনজন গায়ে মাখানোর পর তারা সবাই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন৷ জ্ঞান ফিরে পেয়ে দেখেন তারা একটি নির্জন বটগাছের নিচে। তাদের সব ছিনতাই হয়ে গেছে৷ বিদেশীদের পাসপোর্ট তাদের ব্যাগে ছিল, আর ব্যাগটা ছিনতাইকারী নিয়ে গেছে৷ তারপর পুলিশ ও মামলার ঝামেলা শেষ করতে তিনদিন লাগলো৷ আমি আগেই তাকে এইসব ফালতু কাজে নিজেকে জড়াতে নিষেধ করেছি৷ সে শোনেনি৷ তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সে বাসায় ফিরলে তাকে মুক্তি দিয়ে চলে যাবো৷
তবে এসেই সে সব বিষয় এক নাগাড়ে বলে গেল৷ আমি তার সাথে কথা না বলে শুধু ভ্যানেটি ব্যাগটা নিয়ে সোজা চলে এলাম তোর কাছে৷ আসার আগে টেবিলে একটি চিঠি লিখে এসেছি৷ তার ফেসবুকে ভিডিও রেকর্ড পাঠিয়ে রেখেছি৷ যদিও এখন তার মোবাইল নাই৷ মোবাইলতো কিনবে নাকি? তবে আমি যে তোর কাছে এসেছি তা বলে আসিনি৷ তোকে সে ভালভাবে চিনেওনা৷ কোন ভাবে যদি তোর নম্বর পায়। এবং ফোন করে তুই অবশ্যই বলবি, আমার কাছে আসে নাই৷ বলবিতো, মনি?

তা না হয় বলবো৷ কিন্তু সে যদি থানা পুলিশ করে৷

আরে না, করবে না৷ করলেও আমাকে খুঁজে পাবে না। আমি আমার মোবাইল বন্ধ করে এসেছি৷ যদি মোবাইল নিয়ে আসতাম তাহলে মোবাইল কোম্পানি থেকে জেনে যেত আমি মোবাইলটি কোথায় বন্ধ করেছি৷ তার এক বন্ধু মোবাইল কোম্পানীতে বড় পদে চাকরি করে, সে সব বলে দিত৷ আসার আগে ফোনও করি নাই৷ যদি করতাম তাহলে শেষ ফোনের সূত্র ধরে তোকে ফোন করতো৷ তাই তোকে না জানিয়েই চলে এলাম৷ আসার পথে মার্কেট থেকে নতুন মোবাইল ও সিম কার্ড কিনলাম৷ তুইতো জানিস আমার এনআইডি এখনো পাইনি৷ দোকানদারকে বললাম, আমার এনআইডি নাই৷ আগের নম্বরটি স্বামীর নামে৷ মোবাইল হারিয়ে যাওয়ার পর তুলতে পারছিনা৷ সে দেশের বাহিরে থাকে, এখনতো সিমটি তোলা সম্ভব নয়৷ আপনার থেকে এতো টাকা দিয়ে একটা মোবাইল কিনলাম, আমাকে কিছুদিনের জন্য একটি রেজিস্ট্রেশন করা সিম দিতে পারেন৷ আমার স্বামী বিদেশ থেকে এলে আপনাকে আপনার সিম ফিরত দিব৷ এজন্য আপনি আমার থেকে বাড়তি টাকা নিতে পারেন৷ তাছাড়া আমিতো আর খারাপ মানুষ নই৷ দোকানদার অনেকক্ষণ চিন্তা করে আমাকে একটি রেজিস্ট্রেশন করা নম্বর দিয়ে দিল। কার নামে রেজিষ্টেশন করা তাও জানিনা৷ নম্বরটিও দারুণ, শেষের তিনটি ডিজিট ৭৭৭৷ একেবারে লাকি সেভেন৷ এতো সুন্দর নম্বরের জন্য দোকানদার বাড়তি কোন টাকাও নেয় নাই।
এবার বল, ফাহিম আমাকে খুঁজে পাওয়ার কোন সূত্রেই কি আছে?

তুই এতকিছু শিখলি কোথা থেকে?

সারাদিন একা বাসায় থাকি, আর শুয়ে শুয়ে টিভিতে ক্রাইম পেট্রল দেখি৷ সেখান থেকেই শিখলাম এইসব৷ তুই দেখিস না?

আমার এইসব ক্রাইম-ট্রাইম ভাল লাগেনা৷ আমি শুধু হিন্দি সিরিয়াল দেখি৷ আমার বিশাল বড় বাসা। একা থাকতে হবে এক মাস৷ শাশুড়ি এক মাসের জন্য গ্রামের বাড়ি গেছেন৷ ভালই হলো একজন ভাল সঙ্গী পেলাম৷ তুইতো আমার হোস্টেলের রুমমেট৷ তোকে আমার নতুন করে চিনার দরকার নাই৷

দুলা ভাই তোকে কবে কানাডা নিচ্ছে? সেই কবে থেকে শুনছি চলে যাচ্ছিস, চলে যাচ্ছিস৷

আরও কয়েক মাস লাগবে বলল৷ পিআর এর জন্য এপ্লাই করেছে৷ কোন একটি পেপারে সমস্যা ছিল৷ তবে কয়েকদিন আগে তার এক চাচাত ভাই কুরিয়ারে কাগজটি পাঠিয়ে দিয়েছে৷ এখন নাকি নিশ্চিত পিআর হয়ে যাবে। চলে গেলে তোকে অনেক মিস করব৷ কানাডা নাকি খুব শীতের দেশ। আমার ভাল লাগবে বলে মনে হয় না। শীতকাল একদম পছন্দ না৷ কি আর করা বর যেহেতু ওখানে থাকে যেতেতো হবেই।
তোকে নাস্তা দিচ্ছি৷ তুই কিছুক্ষণ রেস্ট কর৷ ছাদে গিয়ে রাতে চাঁদ দেখতে দেখতে আড্ডা দিব।

মনির মোবাইল ভেজে উঠলো৷ মোবাইলটি ওয়ারড্রপের উপর চার্জে দেওয়া৷
জান্নাত বলে উঠলো, দুলা ভাই হয়তো ফোন দিয়েছে৷
আরে না সে তো ভাইবার, ইমু, ম্যাসেঞ্জারে ফোন দেয়৷ এগুলোর রিংটোন আলাদা৷

-হ্যালো।
-কে বলছেন?
-আমি ফাহিম৷ জান্নাতের বর৷ আপনার বাসার ঠিকানাটা কি দিবেন?
-আস্সালামুআলাইকুম, ভাইয়া৷ কেমন আছেন আপনি? আমার বাসার ঠিকানা কেন ভাইয়া?
-আমার বউ, জান্নাত, আপনার বন্ধবী।তিনি আমার সাথে রাগ করে বাসা থেকে চলে গেছেন৷
-জান্নাত কোথায় এখন?
-আপানার সামনে। মোবাইলটা তাকে একটু দিবেন?
-জান্নাততো আমার বাসায় আসে নাই, ভাইয়া৷
-আপনিতো নাস্তা বানাতে যাচ্ছিলেন শুধু জান্নাতের জন্য তাই না? আমার জন্যও বানাবেন। ঠিকানাটা একটু দিলে আমিও নাস্তা খেতে পারতাম আরকি!

পাশে দাঁড়িয়ে আছে জান্নাত৷ সে হাত দিয়ে ইশারা দিচ্ছে ফোন রেখে দিতে৷ ফাহিমের মুখের উপর মনি মোবাইল রেখে দিল৷ জান্নাত মোবাইলটা বন্ধ করে দিল, যেন আবার ফোন করতে না পারে ৷

ওই জান্নাত৷ তোর বর জানলো কেমনে তুই এখানে?

জানিনাতো। মনে হয় আন্দাজে ঢিল মেরেছে। সে কিন্তু খুব চালাক মানুষ৷ কথা শুনে কি মনে হলো তোর?

যেভাবে কথা বলছে তাতেতো মনে হলো সে নিশ্চিত তুই এখানে৷ আমার ঠিকানা চাইলো৷ আর বলল, তার জন্যও নাস্তা বানাতে৷ বুঝিনা কেমনে কি?

কি বলিস? কিছুইতো মাথায় ঢুকছে না৷

জান্নাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে মাত্র রাত আটটা বাজে। মনিকে বলল, তুই মোবাইল খুলিস না৷ দেখা যাক কি হয়৷

কিছুক্ষণ পর কলিং বেল বেজে উঠল৷

-তোর বর হবে নিশ্চয়।
-আরে না৷ তোর ঠিকানা পাবে কোথায় সে?

মনি বেড রুম থেকে দুটি রুম পার হয়ে এসে দরজা খুলে দিল। দেখে ফাহিম দাঁড়িয়ে আছে৷ মনি তাকে চিনতে পেরেছে, কারণ ফেসবুকে জান্নাতের সাথে তাকে দেখেছে৷

-কেমন আছেন?
-ভাল৷ আপনি?
-জান্নাত’কে একটু ডাকবেন? সে ভিতরের রুমেই আছে৷ আপনি আর মিথ্যা বলবেন না৷ আমি তার কাছে ক্ষমা চাইব৷ আর এসব ফালতু কাজে নিজেকে জড়াবো না৷

জান্নাত অবাক হয়ে তার সামনে এলো৷

-আমি যে মনির বাসায় এলাম তুমি জানলে কিভাবে? আমিতো কোন প্রমাণ রেখে আসিনি৷ তাছাড়া তুমি মনির ঠিকানাও জানো না৷
-তুমি সারাদিন ক্রাইম পেট্রল দেখ আমি জানি৷ বাসায় বেশি সময় দিতে পারিনা, শুধু ব্যবসাটা দাঁড় করানোর জন্য, তবে গোবরের তেল রপ্তানীর ব্যবসায় হাত দেওয়া আমার ঠিক হয় নাই৷ ক্ষমা করে দাও৷
-আগে বল আমি যে মনির বাসায় এলাম, তুমি জানলে কেমনে?
-তোমার ভ্যানেটি ব্যাগের এক কোনায় একটি জিপিএস বসানো আছে, যেটি তোমাকে আগে বলি নাই৷ তোমার নিরাপত্তার জন্য লাগিয়েছি৷ দু’দিন পরপর পত্রিকায় দেখছি মানুষ গুম হচ্ছে, খুন হচ্ছে, আরও কত কি! তাই লাগিয়েছি৷ না লাগালে জানতাম কিভাবে তুমি এখানে? জিপিএস ডিভাইসের মাধ্যমে তোমার শুধু লোকেশন জানতে পেরেছি তা নয়, তোমার সব কথাও শুনতে পেরেছি৷
চল এবার বাসায়, আগামী এক সাপ্তাহ শুধু তোমার জন্য৷

মনি বলে উঠল, জান্নাত একেই বলে সেরের উপর সোয়া সের।

গল্পগ্রন্থঃ জীবনের গল্প

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৩২৩ বার

Share Button