» ইয়াসির আরাফাতের ছোটগল্পঃ রক্তচোষক বিএসএফ ও তানিমের মুক্তি

প্রকাশিত: ২৩. অক্টোবর. ২০১৯ | বুধবার

ছোটগল্পঃ রক্তচোষক বিএসএফ ও তানিমের মুক্তি

লেখকঃ ইয়াসির আরাফাত

বেশ কিছুদিন যাবৎ তানিম বিএসএফের যন্ত্রণায় ঘুমাতে পারে না। অসহ্য এক পীড়ায় দিন যাপন করে সে। ঠিকমতো ঘুম না হওয়ায় সারাদিন তার মেজাজ থাকে খিটখিটে। কেউ ভাল কথা বললেও তার কাছে বিষের মতো মনে হয়। রাফিত তানিমের খুব ভাল বন্ধু, স্কুল জীবন থেকেই তারা একসাথে পড়ালেখা করে এখন একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। দুই বন্ধুর বন্ধুত্ব ও চঞ্চলতায় তারা সারা গ্রাম দাপিয়ে বেড়িয়েছে স্কুল জীবনে। খুব ইচ্ছা ছিল তারা দুই বন্ধু একসাথে থাকবে কিন্তু দূর্ভাগ্য বশতঃ আলাদা আলাদা হলে সিট বরাদ্দ হওয়ার ফলে তাদের আর একত্রে থাকা হলো না।
এদিকে মেজাজ খিটখিটে থাকার জন্য তানিম গার্লফ্রেন্ড তিশার সাথেও খুব বাজে ব্যবহার শুরু করেছে। প্রথম কয়েকদিন সহ্য করলেও এখন তিশা না পারে মানতে, না পারে সহ্যও করতে। যে তানিম-তিশা পরস্পরের জন্য পাগল ছিলো, দুজন দুজনের প্রতি এতটা যত্নশীল ছিল যে দুই প্রান্তে থেকেও প্রতিবেলায় খাওয়ার সময়ে ভিডিও কলে থেকে একসাথে খেতে বসতো। ভালবাসায় যাতে অনাকাঙ্ক্ষিত কারো আগমন না ঘটে সেজন্য তানিম ক্লাসের কোন বান্ধবীর সাথেও কথা বলতো না। ক্লাসের ফাঁকে দুজন মেসেঞ্জারে চ্যাটিং করতো, একদিন তো রীতিমতো স্যারের কাছে ধরা খেয়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যেতেও হয়েছিল তানিমের। স্যার ক্লাস থেকে বের করে দিলো কিন্তু তাতে যেন কিছুই গেল আসলো না। অবশ্য ক্লাসে গিয়ে চ্যাটিং না করার জন্য তিশাও অনেকবার বারণ করেছে কিন্তু কে শোনে কার কথা। তানিমের কাছে যেন তিশা ছাড়া বাকি সব তুচ্ছ। এমন শত শত স্মৃতি মনে করে তিশা নিরবে চোখের জলে সমুদ্র ভাসায় আর ভাবতে থাকে তানিম কেন এতো পরিবর্তন হলো! তাহলে কি এতদিন সে ছলনা করে এসেছে?
চঞ্চল তানিমের মাঝে সেই চাঞ্চল্য নেই, ক্লাসে সবার আগে যাকে পাওয়া যেতো সে এখন ক্লাসে আসে লেট করে, স্যারের চোখ ফাঁকি দিয়ে এখন আর মোবাইলে মেসেজিং ও করে না।এসব বিষয় যখন অন্য বন্ধুদের চোখে পড়তে শুরু করে তখন বন্ধুরাও ভাবতে থাকে হঠাৎ কি হলো তানিমের! সবাই ভেবেছে হয়তো ছ্যাঁকা খেয়ে ছেলেটার এমন অবস্থা। এক বন্ধু তো বলেই বসলো তানিম তোর কাছে আসলে মন পোড়া গন্ধ পাচ্ছি ঘটনা কি সত্যি নাকি? এ বিষয় নিয়ে অন্য বন্ধুরাও হাসাহাসি করতে শুরু করেছে।
তানিম মনে মনে ভাবে, এমনিতেই শত চেষ্টা করে বিএসএফ দমন করতে না পেরে শরীরে রক্ত ক্রমেই কমতে শুরু করেছে, রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে, সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে গেছে তার উপর বন্ধুদের হাসি ঠাট্টা যেন সেরের উপর সোয়া সের হয়ে দাড়িয়েছে। তানিম ভেবেছিল কাউকে না জানিয়ে নিজেই সমস্যা সমাধান করে ফেলবে কিন্তু বাধ্য হয়ে বন্ধুদেরকে বলতে হচ্ছে: বিএসএফের জন্য তার এই অবস্থা হয়েছে।
টানা দুইদিন কথা না বলে তিশাও যেন খুব অস্থির হয়ে গিয়েছে। ভালবাসার মানুষের সাথে অভিমান করে কাটানো সময়গুলো যেন খুবই যন্ত্রণাদায়ক। মনের টানে অভিমান ভুলে তিশা তানিমের নাম্বারে ডায়াল করে আর ভাবে এটাই শেষ বার, যদি কোনরকম খারাপ ব্যবহার করে তাহলে জীবনে আর কোনদিন এই নাম্বারে সে ডায়াল করবে না। রিং বাজতেই তানিম ফোন রিসিভ করলো।
-তুমি ফোন অফ রেখেছিলে কেন দুইদিন?
-আমার সাথে ইদানিং তুমি যে ব্যবহার শুরু করেছিলে তাতে তোমার সাথে কথা বলার ইচ্ছা থাকবে কিভাবে?
-(মনে মনে ভাবে লজ্জার কথা বলি কিভাবে! কিন্তু সম্পর্ক বাঁচাতে হলে না বলে তো উপায় নেই) তিশা আমি খুব সমস্যায় আছি যে কারণে তোমার সাথে মিস বিহেব করে ফেলেছি।
-তোমার সমস্যার কথা আমাকে বলতে পার না তাহলে তো আমি তোমার কাছের মানুষ হতে পারিনি! ভালো বাসতে পারনি তো আমায়!অভিমানী সুরে বলল তিশা।
-আসলে বেশ কিছুদিন ধরেই বিএসএফ আমাকে ঘুমাতে দেয় না। প্রতিদিন শরীরে রক্ত শোষন হওয়ার ফলে শরীরে রক্তস্বল্পতা দেখা দিয়েছে। তুমি রাগ না করে আমাকে কয়েকটা দিন সময় দাও প্লিজ।
আর কথা না বাড়িয়ে তানিম ফোন কেটে দিলো।

তিশা এই বিএসএফের রহস্য উদঘাটন করতে যদি সম্ভব হতো তাহলে তানিমের হলে চলে যেতো কিন্তু সেটা তো আর সম্ভব নয়। কি করবে কিছুক্ষন ভাবার পর তানিমের বন্ধু রাফিতের কথা মনে পড়লো। দেরি না করে তৎক্ষণাৎ রাফিতকে ফোন দিলো। বিএসএফের রহস্য আজ বের করে তানিমকে মুক্ত করবেই এমন একটা পণ করেছে তিশা। রাফিত ফোন রিসিভ করলো: কেমন আছো তিশা? দিনকাল কেমন যাচ্ছে?
-বেশি ভাল না ভাইয়া, তানিমকে নিয়ে মহা ঝামেলায় আছি।
-কেন কি হয়েছে তানিমের?
-বিএসএফ নাকি ওরে খুব যন্ত্রণা দিচ্ছে, সারারাত ঘুমাতে পারে না। শরীর ও নাকি দূর্বল হয়ে পড়েছে। এখন আমাকে এই বিএসএফের রহস্য টা বলেন ভাইয়া প্লিজ! আর আপনিও তো তানিমের এই সমস্যার বিষয়টা জানার কথা…
-রাফিত একটা হাসি দিয়ে বলল আচ্ছা এই কথা। বিএসএফ একটি রুপক নাম। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেদের কাছে এটা পরিচিত। আসলে বিএসএফ বলতে বিশ্ববিদ্যালয় ছারপোকা ফোর্স বলা হয়। কিন্তু তানিম তো আমাকে এই সমস্যার কথা বললো না!
তুমি চিন্তা করো না তিশা এই সমস্যা দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে রয়েছে। তবে আমার কাছে এর সমাধান আছে। আমি সলভ করে দিবো কথা দিচ্ছি।
-আমি ভেবেছিলাম না জানি কত গুরুতর সমস্যায় পড়েছে তানিম। আপনার উপর আস্থা আছে ভাইয়া, সমস্যা সমাধান হলেই আমার পক্ষ থেকে স্পেশাল ট্রিট পাবেন।

কথা শেষ করে রাফিত তানিমকে ফোন করে রাফিতের হলের সামনে বকুলতলায় আসতে বললো। তানিমের মলিন মুখখানা দেখে রাফিত মুচকি মুচকি হাসছে। রাফিতের হাসি দেখে তানিমের মেজাজ ফোর্টি নাইন হয়ে গেল কিন্তু দাঁত কামড়ে রেখে বলল বল কি জন্য ডেকেছিস!
-শুনলাম বিএসএফের জন্য নাকি জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে গেছে তোর! আমাকে তো কিছুই জানালি না…
-তোর পরীক্ষা চলছিল বলেই ডিস্টার্ব করিনি।
-আরে এটা তো কোন সমস্যাই না, তুই আজ থেকে এক সপ্তাহ আমার হলে আমার রুমে থাকবি। তারপর দেখবি তোর সমস্যার সমাধান খুঁজে পাবি।
কোন এক্সকিউজ ছাড়া তানিম রাজি হয়ে গেল। রাতে রাফিতের বেডে শুইয়ে পড়তে দেরি তো ঘুম আসতে দেরি হলো না। এতদিনের ঘুমের ঘাটতির কারণে ঘুমও মনে হয় তানিমের অপেক্ষায় ছিলো।
সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা শেষে রুমে এসে তানিম দেখলো রাফিতের বেডে কোন তোষক, বেডসিট, কাঁথা, মশারি কিছুই নাই। বেলকুনিতে গিয়ে দেখলো সব রোদে দিয়ে সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা শেষে রুমে এসে তানিম দেখলো রাফিতের বেডে কোন তোষক, বেডসিট, কাঁথা, মশারি কিছুই নাই। বেলকুনিতে গিয়ে দেখলো সব রোদে দিয়েছে। পরের দিন সকালে দেখলো রাফিতের অন্য এক রুমমেট গতকালের ন্যায় আজ সব কিছু রোদ মাখাতে দিয়েছে। এভাবেই নিয়মিত তাদের রুমে এটা চলতে থাকে এবং রাফিতরা সপ্তাহে ৩/৪ দিন রুম পরিস্কার ও করে।
সপ্তাহ শেষে রাফিত তানিমকে বললো দেখলি তো আমদের রুমে বিএসএফ কেন থাকতে পারে না! আসলে ছারপোকা এমন একটি রক্তচোষা পরজীবী পতঙ্গ যারা নোংরা পরিবেশে বেশি থাকে। ছারপোকার লালার মাঝে এক রকম প্রোটিন আছে যা লাল লাল ফুসকুড়ির সৃষ্টি সহ অন্যান্য এলার্জির সংক্রমণ ঘটায়। এছাড়া এসব পতঙ্গ মানুষের শরীরে ময়লাযুক্ত একপ্রকার রস নিক্ষেপ করে যা এজমা (হাঁপানি জনিত) রোগের সংক্রমণ ঘটায়। এছাড়া ছারপোকার আক্রমণে এনিমিয়া নামক রক্তশূন্যতার রোগও হয়ে থাকে।
বর্তমানে এদের ক্ষতিকে নিয়ন্ত্রনে আনার জন্য ডিডিটি সহ আরো কিছু কীটনাশক তৈরি হচ্ছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, বেশির ভাগ ছারপোকার কীটনাশক প্রতিরোধের ক্ষমতা আছে এবং এতে করে তাদের প্রজাতির ধ্বংস হচ্ছে না।
তবে নিয়মিত বিছানা রোদে শুকিয়ে নিলে এবং পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকলে ছারপোকার হাত থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

তানিম রুমে গিয়ে রুমমেটদের সাথে বিষয়টি শেয়ার করলো ।এরপর থেকে তারাও রাফিদের মতো নিয়মিত রুম পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে শুরু করলো এবং সপ্তাহে কমপক্ষে এক বার বিছানা সহ সবকিছু রোদে শুকিয়ে নেয়।
এখন থেকে তানিম ঘুমাতে যাওয়ার সময় রাফিতকে মনে মনে হাজারো ধন্যবাদ জানায় এবং আরামে ঘুম দিয়ে ফ্রেশ একটা মন নিয়ে প্রতিদিনের কাজ শুরু করে।

ইয়াছির আরাফাত, ডুয়েট
২২/১০/২০১৯ ইং

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২২৭ বার

Share Button