» বিনাতুন চৈতী’র গল্প-অবশেষে ভালবাসা

প্রকাশিত: ০৯. নভেম্বর. ২০১৯ | শনিবার

লেখা- আল বিনাতুন মাওলা চৈতী
গল্প- অবশেষে ভালোবাসা
(১)
বাবা নাকি আমার বিয়ে ঠিক করেছেন, কোন এক কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারের সাথে। সবেমাত্র আমি মেডিকেল তৃতীয় বর্ষে পড়ি, তাহলে এত তাড়াতাড়ি বিয়ে কিসের জন্য? তার উপর আমি মেডিকেলে পড়ি, তাই আমি ডাক্তার ছেলেকেই বিয়ে করবো। সাহস করে বাবাকে বলেই ফেললাম,
— বাবা, আমি এখন বিয়ে করতে চাই না।
— কেন চাও না? অন্য কাউকে পছন্দ করো?
— না বাবা, আসলে এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে চাইছি না।
— আমি যখন কথা দিয়ে রেখেছি, তখন তোমাকে এক্ষুনি বিয়ে করতে হবে।
নিজেকে খুব দিশেহারা মনে হল। কী করবো আমি? বাবার উপরে তো কোন কথাও বলতে পারবো না। এক কাজ করলে কেমন হয়? ছেলেকে বলে দিবো যে, আমি কাউকে ভালোবাসি।
(২)
বাবা এদিকে আমাকে না বলেই এংগেজমেন্টের তারিখ ঠিক করে ফেলেছে। ছেলে নাকি আমার ছবি দেখেই আমাকে খুব পছন্দ করেছে। তাই আর দেখতে আসার প্রয়োজন বোধ করেনি। কেমন বোকা ছেলে! ছবিতে তো মানুষকে ভালোভাবে বুঝাই যায় না।
যথারীতি নির্ধারিত তারিখে ছেলে তার মা- বাবা সহ হাজির এংগেজমেন্টের জন্য। মা আমাকে সাজিয়ে ছেলের সামনে নিয়ে গেলেন। ছেলে তো দেখতে ভালোই। তবুও আমি এখুনি বিয়ে করবো না। তাই তখন বাবাকে বললাম,
— বাবা এংগেজমেন্টের আগে আমি উনার সাথে একটু কথা বলতে চাই।
বাবা রাগী চোখে আমার দিকে তাকালো। অনুমতি বুঝি দিবে না। কিন্তু আমার কপাল ভালো ছিল। ছেলেটি আমার বাবাকে বললো,
— আংকেল, আমিও আলাদাভাবে কথা বলতে চাই একটু ওর সাথে।
বাবা একটু আমতাআমতা করলো, কিন্তু অবশেষে রাজী হল। আমাদের আলাদা ঘর দেয়া হল কথা বলার জন্য। ছেলেটিই আগে শুরু করলো,
— আমি শুভ। আপনি তো চৈতী, তাই না?
— হুম। তার আগে আমার একটা কথার উত্তর দিন তো। আপনি কেন আমার সাথে এংগেজমেন্ট করতে চলে এলেন?
— এটা তো অনেক সাধারণ ব্যাপার। আপনাকে আমার ভালো লেগেছে, তাই।
— কিন্তু আমি আপনাকে বিয়ে করতে পারবো না।
— কেন?
— কারণ আমি আমাদের কলেজের অয়নকে খুব ভালোবাসি। সেও আমাকে ভালোবাসে। একজনকে ভালোবেসে আরেকজনকে বিয়ে করা কি ঠিক? (বিয়ে ভাংগার জন্য আমাকে এ মিথ্যে কথাটা বলতেই হল।)
— হা হা। এই ব্যাপার! আচ্ছা ঠিক আছে, আমি আংকেলকে গিয়ে এই এংগেজমেন্ট বাতিল করতে বলছি।
শুভর কথায় আমার খুব ভালো লাগলো। যাই হোক, এখন বিয়েটা না হলেই বাঁচি।
শুভ বাবার কাছে এসে বললো,
— আংকেল, আমার আপনাকে একটা কথা বলার ছিল।
বাবা একটু ভয় ভয় চোখে শুভর দিকে তাকিয়ে বললো,
— বলো বাবা।
— আসলে আংকেল, চৈতীকে আমার..
এতটুকু বলে সে থেমে গেলো। বাবার মুখটাও শুকিয়ে গেলো। বাবা আবার ওর দিকে তাকিয়ে বললো,
— কী হল বাবা,বলো।
— আংকেল, চৈতীকে আমার খুব ভালো লেগেছে। আমি ওকেই বিয়ে করতে চাই। আজ এংগেজমেন্টের পর বিয়ের তারিখ ফাইনাল করে যাবো।
এটা কী হল? বিয়ে না করার জন্য এতো কিছু বললাম, আর এ কিনা বিয়ে করার জন্য রাজী হয়ে গেলো! দাঁড়া, একবার বিয়েটা হতে দে, তোর বারোটা আমি বাজাবো।
(৩)
বিয়ের তারিখ একমাস পর ঠিক হয়েছিল। সঠিক দিনে বিয়েও হয়ে গেলো আমার আর শুভর। যদিও আমার কোন মত ছিল না। বিয়ের পর বাসর রাত, আমি বিছানার উপরে বসে আছি। ও এখনো ঘরে আসেনি। একবার আসুক, আজ থেকেই আমি ওর মজা দেখাচ্ছি। কিছুক্ষণ বাদে ওকে ওর খালাতো বোন ধাক্কা দিয়ে ঘরে পাঠিয়ে দিলো। আমাকে অবাক করে দিয়ে ও আমাকে বললো,
— চৈতী, তুমি বিছানায় ঘুমাও, আমি সোফায় ঘুমিয়ে যাচ্ছি।
অদ্ভুত তো! আমি ওকে জব্দ করতে চাইলাম, আর ও আমাকে অবাক করে দিলো? সেদিনের মতো ঝামেলা না বাড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠার পর ফ্রেশ হয়ে ঘর থেকে বেরোলাম। শ্বাশুড়ি মা আমাকে রান্নাঘরে নিয়ে গেলেন। তারপর উনার ছেলের পছন্দ অপছন্দের সব খাবারের কথা বলতে লাগলেন। সকালের নাস্তা শ্বাশুড়ি, বউ মা দুজন মিলেই পরিবেশন করলাম। সবার সাথে সাথে শুভও চলে এলো ডাইনিং এ। বাবা মা এর একমাত্র ছেলে ও। দুপুরের খাবার দায়িত্ব আমার উপর দেওয়া হল। ভাগ্য ভালো, মা আমাকে কিছু কিছু রান্না শিখিয়ে দিয়েছিলেন।
দুপুরের রান্না করার জন্য রান্না ঘরে ঢুকলাম। শাশুড়ি মা আমাকে তখন বলে দিয়েছিলেন যে, শুভ মুরগীর মাংস পছন্দ করে। তাই শুভর জন্য মুরগীর মাংস রান্না করি, আর বাকিদের জন্য সবজি আর রুই মাছের ঝোল।
হঠাৎ আমার মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি এলো শুভর তরকারিতে লবণ দিবো না, কিন্তু ঝাল বেশি করে দিবো। যেমন ভাবা তেমন কাজ। রান্নাবান্না শেষ করে সবাইকে খাবার পরিবেশন করে, শুভর খাবারটা নিয়ে আমাদের ঘরে চলে গেলাম। ওর সামনে খাবারটা রেখে বললাম,
— শুভ, তোমার নাকি মুরগীর মাংস খুব পছন্দ? তাই আমি তোমার জন্য নিজের হাতে রান্না করেছি।
শুভ খাওয়া শুরু করলো। ভাবলাম শুভ খাবার খেয়ে চিৎকার করবে। কিন্তু তা হল না। আমাকে অবাক করে দিয়ে ও রান্নার খুব প্রশংসা করলো। আমি কি তবে ঠিকঠাক ঝাল দিলাম! শুভ খাবার শেষ করে ওয়াশরুমে চলে গেলো। আমিও ভাত, তরকারী বেড়ে খাওয়া শুরু করলাম। কিন্তু একি! এত ঝাল! অসহ্য। ঝালে চিৎকার শুরু করে দিলাম। চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে গেলো। এর মাঝে পানিভর্তি একটি গ্লাস আমার দিকে এগিয়ে এলো। তাকিয়ে দেখলাম, শুভ আমার জন্য পানি নিয়ে এসেছে। ও আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
— কি খবর, মহারানী? আমাকে জব্দ করতে গিয়ে নিজেই ফেঁসে গেলে তো। ঝাল খাওয়ার অভ্যেস আমার আছে। জানি, আমার উপর তোমার খুব রাগ। যত খুশি প্রতিশোধ নিতে পারো। কিন্তু, তুমি মন থেকে আমাকে না ভালোবাসলে, আমিও ভালোবাসার দাবি নিয়ে তোমার সামনে দাঁড়াবো না।
ওর কথা শুনে আমি মনে মনে ভাবি, সে আশা তোমার গুড়ে বালি। তার জন্য কত যুগ অপেক্ষা করতে হয়, তাই দেখো। আমার কত ইচ্ছা ছিল, ডাক্তার কোন ছেলেকে বিয়ে করার।
শুভ অফিসে যাওয়ার আগের রাতে ওর জামা কাপড় ঠিক করে রাখে। একদিন আমি ওর শার্টের পিছনে লিপস্টিকের দাগ লাগিয়ে দিলাম। পরদিন সকালে শুভ শার্টটা গায়ে দিয়ে অফিসে গেলো। আমি মনে মনে একচোট হেসে নিলাম। শুভ ফিরে আসার পর আমাকে হয়তোবা অনেকগুলো কথা শুনিয়ে দিবে। রাতে শুভ ফিরে এলো। আমি ওর কথা শুনে তার জবাব দেবার জন্য প্রস্তুত। শুভ আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
— কি খবর মহারানী? খাওয়া দাওয়া হয়েছে?
এগুলো কী বলছে শুভ! ও আমাকে কোন কথা শুনাচ্ছে না কেন? আমি উত্তর দিলাম,
— খাবো নয়তো কী? কারো জন্য অপেক্ষা করবো নাক

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৭৬ বার

Share Button