» হায়রে করোনা!

প্রকাশিত: ০৭. এপ্রিল. ২০২০ | মঙ্গলবার

তুফান মাজহার খান
বিশ্বজুড়ে চলছে মহামারি করোনা ভাইরাসের তাণ্ডব। চীন, ইতালিসহ বর্তমানে দেড় শতাধিক দেশ করোনার ছোবলে কুপোকাত। আমরা বাংলাদেশিরাও ভালো নেই। সমানতালে জনমনে চলছে করোনাআতঙ্ক। নানা ঘটনা, রটনা আর গুজব নামক ভাইরাসও ছড়াচ্ছে করোনার সাথে সাথে।
এই ভয়াবহ সময় সেদিন শখ করে বৃষ্টিতে সামান্য ভিজেছিলাম। আর তাতেই যত বিপত্তি। রাতে শুরু হলো প্রচণ্ড মাথাব্যথা। সাথে বেশ কয়েকটি হাঁচি। পরপরই শুরু হলো নাক দিয়ে পানি ঝরা। কিছুক্ষণ পর মনে হলো জ্বরও আসতে শুরু করেছে। গা অস্বাভাবিক গরম লাহছে। ঘরে হিস্টাসিন, প্যারাসিটামল, এন্টাসিড, মেট্রোনিডাজোলসহ বেশ কয়েকটি ওষুধ সবসময়ই থাকে। তবে আমার একটা অভ্যাস হলো, আমি ডাক্তার না দেখিয়ে ওষুধ খাই না। এত রাতে কোথায় পাব ডাক্তার? তাই সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সকালে কমিউনিটি ক্লিনিকে যাব। খুব স্বাভাবিক মন নিয়ে মুখে মাস্ক লাগিয়ে পাড়ার মোড়ে গেলাম। উদ্দেশ্য হলো সেখান থেকে রিকশা নিয়ে বাজারে যাব। বর্তমানে সাধারণ রিকশা চলে। অর্থাৎ সবই আধুনিক প্রযুক্তির ব্যাটারিচালিত রিকশা। এক রিকশায় অন্তত চার-পাঁচ জন যাত্রী নিয়ে তবেই রিকশা ছাড়ে। অনেকগুলো রিকশা সিরিয়ালে দাঁড়ানো। সবার সামনে যে রিকশা সেটাতে একজন বোরকা পরা অর্ধবয়স্ক মহিলা বসা। আমিও স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই গিয়ে উনার সামনের সিটে বসার রিকশায় সবেমাত্র একটি পা রাখলাম। আর সাথে সাথে মহিলাটি লাফিয়ে নেমে গিয়ে পিছনের রিকশায় বসল। আমি কিছুই বুঝে ওঠতে পারলাম না। এদিকে রিকশাওয়ালা রিকশা রেখে পান মুখে দিতে পাশের দোকানে গিয়েছিল। রিকশাওয়ালা মহিলাকে নেমে যেতে দেখে বলল, ও খালা, নেমে পড়লেন কেন? বোরকার ভেতর থেকে মহিলাটি বলল, করোনা রোগীর সাথে আমি যাব না। আমি যেন হতভম্ব হয়ে গেলাম। মহিলা বলে কী? আমি করোনা রোগী হতে যাব কেন? আমি রিকশাওয়ালাকে বললাম, মামা, আমি করোনা রোগী না। রিকশাওয়ালা মহিলাকে কিছুতেই বোঝাতে পারল না। মহিলার এক কথা, করোনার রোগী না হলে উনি মাস্ক পরেছে কেন? গ্রামের অবলা নারীর এমন কথায় অবাক হওয়ার কিছু নেই। মহিলাকে বাদ দিয়ে পরে আরও কয়েকজন যাত্রী হলে গন্তব্যে গেলাম। ক্লিনিকে গিয়ে দেখলাম রোগীর লম্বা লাইন। প্রায় দশ-বারো জনের পরে আমার সিরিয়াল। প্রায় চল্লিশ মিনিট দাঁড়িয়ে দেখে ডাক্তারের কাছে যেতে পারলাম। ডাক্তার বলল, কী সমস্যা? আমি বললাম, গত রাত থেকে সর্দি, মাথাব্যথা আর জ্বর। ডাক্তার আমার কথা শুনে লাফিয়ে চেয়ার ছেড়ে সরে গেল। হাতে একটা জীবাণুনাশক নিয়ে স্প্রে করতে করতে আমাকে বলল, ভাই দয়া করে আপনি দ্রুত বের হোন। আমি জানালা দিয়ে আপনার সাথে কথা বলছি। উনার কথামতো বাইরে চলে গেলাম। ডাক্তার আরও কিছুক্ষণ স্প্রে করে তারপর জানালায় এসে দূর থেকেই বলল, ভাই এখানে করোনার চিকিৎসা হয় না। আপনি সদর হাসপাতালে যান। আপনার লক্ষণ শুনে মনে হচ্ছে আপনি করোনায় আক্রান্ত। আমি উনাকে বোঝাতেই পারলাম না যে, এটা আমার বৃষ্টিতে ভেজার কারণে হয়েছে। অবশেষে চলে আসতে বাধ্য হলাম।
বাইরে বেরিয়ে ভাবলাম, যেহেতু বাজারের এত কাছে এসেছি, কিছু বাজার করে নিয়ে যাই। কিছু শাক-সবজি আর মাছ নিয়ে বাসায় গেলাম। আমার স্ত্রী নিজের ছোট্ট বাচ্চা সামলে একা সব কাজ করতে পারে না বলে একজন বুয়াও রেখেছি। বাসায় গিয়ে দেখি তারা আমার পথ চেয়ে বসে আছে। সম্ভবত ঘরে রান্নার তেমন কিছু নেই। তারা জানে আমি বাজারে গেলে খালি হাতে ফিরি না। বাজারের ব্যাগটা বুয়ার হাতে দিয়ে নিজের ঘরে ঢুকলাম। বিছানানায় পিঠ লাগাতেই বুয়ার চিৎকার শুনে বাইরে বেরিয়ে এলাম। বুয়া কিচেন থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এসে আমার স্ত্রীকে বলল, আফা গো আফা, আমি আইজ রান্না করুম না। সে বলল, কেন বুয়া, কী হয়েছে? বুয়া বলল, ভাইজানের আক্কেলডা দেহেন। সারাদেশে হমানে করলা ভাইরাস ছড়াইছে। আর উনি করলা কিইন্না আনছে। আমার স্ত্রী বুয়ার কথা শুনে যেন হেসেই খুন। আমিও বারান্দায় দাঁড়িয়ে মুখ টিপে হাসছিলাম আর তাদের কথোপকথন শুনছিলাম। তারপর আমার স্ত্রী বুয়াকে করোনা ভাইরাসের কথা ভালো করে বুঝিয়ে বলার পর বুয়া আবার কিচেনে ঢুকল।
দুপুরে ভাত খেয়ে একটা হিস্টাসিন আর প্যারাসিটামল ট্যাবলেট খেয়ে লম্বা ঘুম দিলাম। সন্ধ্যার দিকে চোখ মেলে দেখি গায়ে জ্বরও নেই, নাকটাও বেশ পরিষ্কার। অথচ ডাক্তারের আচরণে মনে হচ্ছিল আমি কতই না অপরাধী। জীবনের প্রথম আজ ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খেলাম। করোনা না আসলে হয়ত জানতাম না যে, আমিও ছোটখাট একজন ডাক্তার।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৮৭ বার

Share Button