» বই প্রকাশের খরচ

প্রকাশিত: ৩০. মে. ২০২০ | শনিবার

আসুন জেনে নিই, বই প্রকাশের খরচের ধাপসমূহঃ

খরচের ধাপসমূহ বলার পূর্বে কিছু কথা- একেকটা প্রকাশনী বা প্রেস বা বাইন্ডার একেক কৌশল বা দরে কাজ করে থাকে। সবাই সবার জায়গায় সঠিক।

আমার লিখিত খরচের ধাপসমূহ কেবলমাত্র সাহিত্য রস প্রকাশনী হতে বই প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং তরুণ লেখকদের বাস্তবতা শিখানোর কৌশল বৈ কিছু নয়। কোনো প্রকাশক এই পোস্টে মনঃক্ষুণ্ন হবেন না।

১। পাণ্ডুলিপি কম্পোজ করতে হলে পার পৃষ্ঠা ২০টাকা আর ইউনিকোড হতে কনভার্ট করার ক্ষেত্রে পার ফর্মা ৫০ টাকা।

২। প্রুফ দেখানোর ক্ষেত্রে পার ফর্মা ২০০ টাকা।

৩। প্রচ্ছদ, কভারে ফ্ল্যাপ সেটিং এর জন্য ১৫০০ থেকে দশ হাজার টাকা। কারণ প্রচ্ছদ শিল্পীর খ্যাতির উপর নির্ভর করে প্রচ্ছদের দাম।

৪। ফর্মা সেটিং ও প্লেট মেকআপ পার ফর্মা ১৫০ টাকা।

৫। প্লেট তৈরি (ডবল ডিমাই): পার প্লেট ৪০০ টাকা (এক কালার বইয়ের জন্য), ১৬০০টাকা (ফোর কালার বইয়ের জন্য)।

৬। কভার প্লেট, প্রিন্ট, কাগজ, স্পট ও লেমিনেশন এবং পোস্তানি সহ (২০০ কপি বইয়ের জন্য): ৩৫০০ টাকা।

৭। প্রিন্টের জন্য (ডবল ডিমাই): পার প্লেট ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা (এক কালার বইয়ের জন্য)। ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা (ফোর কালার বইয়ের জন্য)।

৮। কাগজঃ পার রিম ১৭০০ থেকে ২০০০ টাকা। কাগজের হিসাব কীভাবে বের করতে হয়- নিচে পড়ুন।

৯। কাগজে সলিড মারাঃ সলিড মারা বলতে বুঝায় – কাগজকে সাদা হতে কোনো একটি কালারে রূপ দেয়া, এতে কাগজ একটু মোটাও হয়ে থাকে, দেখতে সুন্দর লাগে।
সলিড খরচঃ পার রিম ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা।
তবে সলিড না মারলেও বই হয়। এটা ঐচ্ছিক।

১০। বই বাইন্ডিং খরচঃ পিন বাইন্ডিং ৪টাকা, বোর্ড বাইন্ডিং ১৫ থেকে ২০ টাকা পার বই।

১১। আইএসবিএন চার্জঃ ২০০ টাকা যাতায়াত খরচ সহ।

১২। সিস্টেম লস চার্জঃ ২০০০টাকা (সিস্টেম লস কী? তা নিচে বুঝিয়েছি)।

এবার আপনার বই কত ফর্মার, কয় কপি প্রকাশ করতে চান, নিজে নিজে হিসাব করে সাহিত্য রস প্রকাশনীতে বই প্রকাশের অর্ডার দিতে পারেন।

# বইয়ের সিস্টেম লস কী?

অনেকেই বলে থাকে- বই প্রকাশের খরচ হয় ১২ হাজার টাকা, প্রকাশক নেয় ১৭০০০ টাকা।

এর কারণ হলো- সিস্টেম লস।

ধরুন, ২০০ বইয়ে টু দা পয়েন্টে কাগজ লাগবে ২ রিম ৩৪০০ টাকার।
তথ্যটি পারফেক্ট নয়।
২০০ কপি বই টিকাতে ২৩০ টি টার্গেট নিতে হয়।
কারণ, প্রিন্টে কিছু কাগজ নষ্ট হবে। বাঁধাইয়ে কিছু বই নষ্ট হবে।
তাই কাগজের খরচটা বাড়বে।
কাগজ ক্রয়ে ব্যক্তির যাতায়াত খরচ, কাগজ প্রেসে পাঠানোর খরচ, প্রেস হতে বাইন্ডিংয়ে পাঠানোর খরচ, বাইন্ডিং হতে গোডাউনে আনার খরচ, গোডাউন ভাড়া।
এসব হলো সিস্টেম লস।

তাছাড়া প্রকাশনী মানিই ব্যবসা। ওখানে কিছু পারসেন্ট তো অতিরিক্ত যোগ হবেই।

আপনি বলবেন, অতিরিক্ত কেন! বই বেচে আয় করবেন। নবীনদের বেলায় ওই স্বপ্ন না দেখাই উত্তম।

খ্যাতিমানদের বেলায় তো টাকা লাগে না। উল্টো প্রকাশক অগ্রিম দেয়।

আগে মূলধন ইনভেস্ট করে খ্যাতিমান হোন, তারপর ওই স্বপ্ন দেখবেন।

ডাক্তার হতে চল্লিশ লাখ খরচ করতে পারেন, লেখকের খ্যাতি পেতে করবেন না?
কেন, লেখকের মর্যাদা কি ডাক্তার থেকে কম?

হ্যাঁ, সরকারি কলেজে খরচ লাগে না। তাহলে বলবো, সরকারকে বলুন আপনাদের লেখক হতে ওরকম কয়েকটা প্রকাশনী করে দিতে।
বেসরকারি জন থেকে ওই আশা করেন কেন!

কষ্ট পাবেন না। সিস্টেম লসটা বুঝালাম।

## ফর্মা কী? কীভাবে কাগজের হিসাব বের করতে হয়? এসব আলোচনা করছি।

ফর্মা হলো ২৩”×৩৬” সাইজ কাগজ।
এতে ৮টা ভাঁজ হয়। তথা আট পাতা বা ১৬ পৃষ্ঠা।

সেমতে বলা যায়, ১ফর্মা মানি ১শীট কাগজ, যা দিয়ে ১৬ পৃষ্ঠা হয়।

৫০০সিটে এক রিম।
এক রিম কাগজের দাম ১৭০০ হতে ২২০০ টাকা (কাগজের মান অনুযায়ী এবং বাজার আপ-ডাউন হয়)।

ধরো, পাঁচ ফর্মার ২০০ কপি বই করবে।
তো একটা বইয়ে তোমার কাগজ লাগবে পাঁচ শীট।
সুতরাং ২০০ বইয়ে কাগজ লাগবে ১০০০ শীট। তথা দুই রিম তথা ন্যূনতম দাম ৩৪০০টাকার ইনার কাগজ।
তবে আরো ১৫০শীট কাগজের দাম বেশি যোগ করবে, কারণ ২০০বই টিকাতে ২৩০কপি বইয়ের টার্গেট নিতে হয়। কেননা প্রিন্ট ও বাঁধাইয়ে কিছু কাগজ বা বই নষ্ট হয়ে থাকে।

আশা করছি, ফর্মা আর কাগজের হিসাব ও খরচ বের করতে আর কখনো সমস্যা হবে না।

### বই প্রকাশের জন্য কেনো প্রকাশনীকে কেন দায়িত্ব দিতে হয়?
কারণ, মানসম্মত বই প্রকাশ করতে অনেক কষ্টকর ধাপ পেরুতে হয়।

আসুন জেনে নিই বই প্রকাশের ধাপসমূহঃ

১। হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি সুটনি এমজে ফন্টে কম্পোজ করতে হয় অথবা অভ্র বা ইউনিকোড এ লেখা পাণ্ডুলিপি সুটনি এমজে ফন্টে কনভার্ট করতে হয়।

২। ওয়ার্ড ফাইলটা বুক সেটিং পেজে পাণ্ডুলিপি সেটিং করতে হয়।

৩। জাতীয় গ্রন্থ আর্কাইভ, আগারগাঁও থেকে আইএসবিএন সংগ্রহ করতে হয়।

৪। ওয়ার্ড ফাইল প্রিন্ট করে দুই থেকে তিনবার প্রুফ করাতে হয়। একবার করালে ভুল থেকে যেতে পারে।

৫। প্রুফ সম্পন্ন হলে ওয়ার্ড ফাইলকে পিডিএফ ফাইলে কনভার্ট করতে হয়।

৬। পিডিএফ ফাইলকে ইলেস্টেটর এ ফর্মা সেটিং করতে হয়।

৭। ফর্মা সেটিংকৃত ফাইলকে প্লেট মেকিং এর জন্য প্লেট সেটিং করে আউটলাইন করতে হয়।

৮। প্রচ্ছদ শিল্পী দিয়ে বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকাতে হয়।

৯। প্রচ্ছদটা ফ্ল্যাপ সহ বইয়ের কভার সেটিং করে আউটলাইন করে প্লেট সেটিং করতে হয় এবং স্পট মার্কিং করতে হয়।

১০। সেটিংকৃত সমস্ত প্লেট সিটিপি সেন্টারে পাঠিয়ে প্লেট তৈরি করাতে হয়।

১১। তৈরিকৃত প্লেট গুলো প্রেসে পাঠাতে হয়। এবং কাগজ কিনে প্রেসে পাঠাতে হয়।

১২। প্রিন্ট হবার পর কভারটা ম্যাটস্পট ও লেমিনেশন এ পাঠাতে হয়। আর ইনার তথা মূল বইয়ের প্রিন্টকৃত কাগজগুলো বাঁধাইখানায় পাঠাতে হয়।

১৩। বাইন্ডিং করার সময়- ফর্মা অনুযায়ী কাগজ ভাঁজ করতে হয়, ভাঁজকৃত কাগজগুলোর উপরে পোস্তানি লাগিয়ে সিলি দিতে হয়, বোর্ডপেপার কাটতে হয়, জেল ধরায়ে শুকাতে হয়, শুকানোর পর সিলিকৃত ফর্মা জেলকৃত বোর্ডে গাম দিয়ে আটকায়ে চাপে রেখে পুনরায় শুকাতে হয়। তারপর লেমিনেশনকৃত কভার আনিয়ে বইয়ের উপর লাগাতে হয়।

ব্যস হয়ে গেল আপনার স্বপ্নের বই।

★★★
প্রকাশনায় প্রতারণা বলতে কী বুঝ? বা প্রকাশক নাকি ঠক বা প্রতারক হয়।
আসুন জেনে নিই, প্রকাশকরা লেখকদের ঠকায় কেন?:

উপরের আলোচনায় প্রকাশনা জগতের সব টুকিটাকি আলোচনা করেছি। ভাবছেন, বিন আরফান একটা বিষয় স্পষ্ট করলো না, এড়িয়ে গেলো।
বিষয়টা তা নয়, এটাও ধারাবাহিক ছিল। তাই এ প্রসঙ্গে শেষেই আলাপ করছি।

এই সমস্যাটা নবীন আর আনাড়ি লেখকদের সাথে বেশি হয়।

একটা কথা প্রথমেই বলে নিতে চাই, কোনো প্রকাশকই তার কলিজা আগুনে পোড়ায়ে খাবে না। আর লেখক হলো সব প্রকাশকের কলিজা।
হ্যাঁ, হয়তো কিছু প্রকাশক লাভের মাত্রা বেশি করে। তবে ওসবও লেখকের সাথে দর কষাকষি করেই সম্মতিতে করে।

কখন মনে হয় প্রকাশক প্রতারক?
১। যখন বই ‘বইমেলার’ এক তারিখে স্টলে না আসে।
২। যখন বই লেখকের চোখ না জুড়ায়।
৩। যখন সব বই বইমেলার শুরুতে লেখককে ডেলিভারি দেয়া না হয়।

এবার আমার অভিজ্ঞতার আলোকে এসবের জবাব দিচ্ছি।
বই প্রকাশ করতে গিয়ে একটা টিমওয়ার্ক তথা কতগুলো ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। একটা ধাপ ডিফল্ট করলেই বই সময়মতো স্টলে আসবে না।
মনে রাখবেন, প্রকাশক প্রেস, বাইন্ডার, সিটিপিসহ অনেকের উপর নির্ভরশীল। তাদের কোনো একজন দেরি করলে প্রকাশক নিরুপায় হয়ে যায়।
আর এসব হতেই পারে। তার মানে এই নয়, প্রকাশক প্রতারক। জাস্ট কাজটা দেরি হয়েছে।

দুই- তেল দিবেন কম, খেতে চাইবেন মচমচা! এমনটা যখন হয়, তখন প্রকাশককে প্রতারক মনে হয়। কারণ আপনি হয়তো আপনার আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। একই সাইজের বই আরেকজন দ্বিগুণ টাকায় করায়েছে।
ব্যবসায়িক খাতিরে বিভিন্ন মানের বই করতে হয়।
তাই ওইজন্যও প্রকাশককে প্রতারক বলা যাবে না।
আরেকটা কথা পরের বউ সবসময়ই সুন্দরই মনে হয়। এটা মনের শয়তানি।

তিন- বইমেলা চলাকালীন প্রকাশকদের নানামুখী কাজের চাপ বাড়ে। তখন কাউকে বই বুঝিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া লেখকের পরিচিতির জন্য বই বিভিন্ন স্টলে পাঠানো হয়। তাই তাকে মেলা চলাকালীন বই দেয়া সম্ভব নয়। বই মেলা শেষে বুঝে নিতে হয়।
ওই জন্য প্রকাশককে প্রতারক বলা উচিত নয়। বললে মূর্খতা।

তবে হ্যাঁ, বইমেলা কেন্দ্রীক বইয়ে কিছুটা বিড়ম্বনা লেখককে সইতে হয়। কারণ-
প্রকাশকের বই প্রকাশ চলমান একটা কার্যক্রম। একটা চুক্তি হচ্ছে, আরেকটা প্রিন্টে আছে, আরেকটা বাইন্ডিংয়ে আছে।
এরমধ্যে যদি কেহ কথা মতো টাকা না দিয়ে আটকে দেয়। তখন তারজন্য আরেকজনের বইও আটকে যেতে পারে। কারণ প্রকাশকতো টাকার গাছ নিয়ে বসে নেই।
তাই সাময়িক প্রতারক মনে হলেও মূলত কতক লেখকদের প্রতারণা বা সমস্যায় আটকে যাওয়ার খেসারত প্রকাশককেই দিতে হয়। তবে ওইজন্য লেখক প্রকাশক উভয়কেই লিখিত চুক্তি করে নিতে হয়।

সবাইকে ধন্যবাদ।

বিন আরফান
প্রকাশক
সাহিত্য রস প্রকাশনী।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২৩৬ বার

Share Button